February 6, 2026, 5:01 pm


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-01-09 15:48:28 BdST

আইনি জটিলতা-বিতর্কচট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগে বড় পরিবর্তন


নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি টার্মিনাল নিয়ে গত ১৭ নভেম্বর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা নিয়ে একটি এবং ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে অন্য চুক্তিটি হয়।

ঐদিন ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত পৃথক দুই অনুষ্ঠানে চুক্তি দুটি সই হয়েছে। তবে স্বাক্ষরটা প্রকাশ্যে হলেও চুক্তিতে বিস্তারিত কী কী শর্ত রয়েছে এবং কী কী তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। যদিও নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেছেন, চুক্তির বিভিন্ন শর্তের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।

এদিকে চুক্তির বিরোধিতা করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পক্ষ বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল ও বিবৃতি দিয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, বিদেশিদেরকে বন্দর দেওয়া হচ্ছে না। পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই এবার দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এই প্রক্রিয়া ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও আইনি জটিলতা।

পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই স্থানীয় অপারেটর নিয়োগের বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর এই যাবৎকাল মূলত ‘টুল পোর্ট’ মডেলে পরিচালিত হয়ে এলেও এখন ‘ল্যান্ডলর্ড’ মডেলের দিকে ঝুঁকছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই মডেলে বন্দরের জমি সরকারের হাতে থাকলেও টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে বেসরকারি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান।

এরই মধ্যে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পতেঙ্গা টার্মিনালের দায়িত্ব নিয়েছে। এছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড (সংযুক্ত আরব আমিরাত), পিএসএ (সিঙ্গাপুর) এবং এপিএম টার্মিনালস (নেদারল্যান্ডস)-এর মতো বিশ্বসেরা অপারেটররা এনসিটি ও বে-টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করলে সক্ষমতা বাড়বে এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের সেবা নিশ্চিত হবে। তবে লয়েডস লিস্টে বর্তমানে ৬৭তম অবস্থানে থাকা এই বন্দরের মূল অবকাঠামো নিজস্ব অর্থায়নেই নির্মিত, তাই লাভজনক টার্মিনালগুলো বিদেশিদের হাতে দেওয়া নিয়ে শ্রমিক ও দেশীয় পেশাজীবীদের মধ্যে প্রবল আপত্তি রয়েছে।

আইনি জটিলতায় নতুন অপারেটর নিয়োগ

বিদ্যমান বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের পাশাপাশি নতুন করে অপারেটর নিয়োগের জন্য লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫ এর আলোকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কিন্তু বার্থ হ্যান্ডলিং অপারেটর এম এইচ চৌধুরী লিমিটেডের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত নতুন অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়াটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। আদালতের এই স্থগিতাদেশের ফলে বন্দরের অপারেশনাল কাজে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা আপাতত থমকে আছে।

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘লাইসেন্সের বিষয়ে আপাতত কথা বলার কোনো সুযোগ নেই, যেহেতু এটি বিচারাধীন বিষয়। একটি আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এতে স্টে অর্ডার দিয়েছে। তবে অন্যান্য দিকে বন্দরের উন্নয়ন কোথাও থেমে নেই। হ্যান্ডেলিং ও অন্যান্য দিকে বন্দর এগিয়ে যাচ্ছে।’

বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, ১৩ কোটি টন পণ্য ও ৩৩ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আরও দক্ষ ও আধুনিক অপারেটর প্রয়োজন।

সদ্যসমাপ্ত বছরে চট্টগ্রাম বন্দর আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে সর্বোচ্চ ৩৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড গড়েছে।

শঙ্কা ও বিরোধিতা

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিউমুরিং টার্মিনালের (এনসিটি) মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল, যেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, সেখানে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে বলেও কোনো কোনো মহল থেকে দাবি তোলা হয়েছে।

তবে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বিদেশি অপারেটর শুধু টার্মিনাল পরিচালনা করবে এবং মাশুল নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতেই থাকবে।

অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষতা বাড়াতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ জরুরি। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ রাখা উচিত।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো আইনি বাধা কাটিয়ে এবং সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে বন্দরের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর নিয়ে হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায় সত্ত্বেও সরকার চুক্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা করতে গত সোম ও মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা হোটেলে কর্মশালার আয়োজন করা হয়। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত বিচারাধীন।

উল্লেখ্য, গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা নিয়ে একটি এবং ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়েও অন্য চুক্তিসহ মোট দুটি চুক্তি সই হয়।

এর মধ্যে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে করা চুক্তিতে সই করেন ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টেইন ভ্যান ডোঙ্গেন ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।

অন্যদিকে পানগাঁও নৌ টার্মিনালবিষয়ক চুক্তিতে সই করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ও মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ টি এম আনিসুল মিল্লাত। এখানেও নৌপরিবহন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি অনুসারে, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং ৩০ বছরের জন্য এটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালর্স। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এই টার্মিনাল নির্মাণের জন্য কোম্পানিটি ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পরপরই ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে, ২২ বছরের জন্য ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ। এই টার্মিনালে মোট ৪ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে মেডলগ। এক্ষেত্রে সাইনিং মানি হিসেবে তারা বাংলাদেশকে দিয়েছে ১৮ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, লালদিয়া টার্মিনালে বছরে আট থেকে ১০ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো–নামানোর সক্ষমতা থাকবে। এর মধ্যে আট লাখ পর্যন্ত প্রতি একক কনটেইনারে ২১ ডলার (প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা) করে পাবে সরকার। আর আট লাখের বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো হলে প্রতি একক কনটেইনারের জন্য পাবে ২৩ ডলার করে।

অন্যদিকে পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বছরে এক লাখ ৬০ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হবে বলে জানিয়েছে মেডলগ। প্রতি একক কনটেইনার থেকে ২৫০ টাকা করে পাবে সরকার।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.