May 16, 2026, 1:30 pm


সাকিফ শামীম

Published:
2026-05-16 12:03:32 BdST

লজিস্টিক্স থেকে ডিজিটাল গভর্নেন্সপ্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে বাজেট কেমন হওয়া উচিৎ?


বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রয়োজন দক্ষ সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন এবং কার্যকর ডিজিটাল গভর্নেন্স। বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের সমন্বয়ই আগামী অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেবল আয়–ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত রূপরেখা।

নতুন জাতীয় বাজেট এমন সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এই বাস্তবতায় বাজেটকে শুধু ব্যয় ও রাজস্বের দলিল হিসেবে না দেখে, অর্থনীতিকে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিনিয়োগবান্ধব করার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করার দাবি উঠছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যয় মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উন্নত অর্থনীতিতে এই হার সাধারণত ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে। ফলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়ের চাপে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাপ, রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং গুদাম ব্যবস্থার দুর্বলতা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে। তাই ২০২৬–২৭ বাজেটে এই খাতে আলাদা কৌশলগত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

ঢাকা–চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দর সংযোগ, শুকনো বন্দর, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বহুমাধ্যম পরিবহন কাঠামোর উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ দরকার। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য সড়কপথে পরিবহন হওয়ায় ব্যয় ও সময় দুইই বাড়ছে। বাজেটে রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারে প্রণোদনা দিলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলের জন্য পৃথক লজিস্টিক জোন গঠনের প্রস্তাবও গুরুত্ব পাচ্ছে।

অন্যদিকে, নতুন বাজেটে ডিজিটাল প্রশাসন ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হচ্ছে। যদিও ব্যবসা নিবন্ধন, ভ্যাট, কর, শুল্ক ও লাইসেন্স সংক্রান্ত অনেক সেবা এখন ডিজিটাল হয়েছে, তবুও এগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সমন্বিত নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার কারণে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে সরকারি সেবাগুলোকে একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ডিজিটাল প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হলে প্রশাসনিক ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি হ্রাস পাবে।

বর্তমানে দেশের রাজস্ব–মোট দেশজ উৎপাদন অনুপাত প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই করহার বাড়ানোর পরিবর্তে ডিজিটাল কর প্রশাসন জোরদার করাকে এখন বেশি কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কর নিরীক্ষা, ই-চালান ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি হলেও গ্রামীণ এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট ও মানসম্মত ডিজিটাল সেবার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, জাতীয় ডাটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা এবং সাইবার নিরাপত্তা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে স্টার্টআপ, ফিনটেক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্ভাবনী খাতকে এগিয়ে নিতে কর সুবিধা এবং ভেঞ্চার ফান্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

রপ্তানি খাতের কাঠামো বৈচিত্র্যময় করাও বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই নির্ভরতা কমাতে ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর সুবিধা ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজীকরণ এবং দ্রুত শুল্ক ছাড় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে অপ্রচলিত রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসছে বাজেট বাস্তবায়ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এই অবস্থায় প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ই-গভর্নেন্সভিত্তিক ট্র্যাকিং চালু করা এবং সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে অপচয় ও অনিয়ম কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নকে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী সম্ভাবনাময় হলেও দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা। তাই কারিগরি শিক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা বিশ্লেষণ এবং সাইবার নিরাপত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠলে তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরির কৌশল হিসেবে প্রণয়ন করতে হবে। লজিস্টিক্স দক্ষতা, ডিজিটাল গভর্নেন্স, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আগামী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সঠিক নীতি, বাস্তবসম্মত বরাদ্দ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক। তিনি পেশাগত জীবনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) এর চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.