নেহাল আহমেদ, কবি ও সাংবাদিক
Published:2026-02-07 16:08:03 BdST
শিক্ষা: মুক্তির প্রতিশ্রুতি না নিয়ন্ত্রণের কৌশল?
মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শনের মূল স্তম্ভ। তিনি প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার বিরুদ্ধে ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন অনুসন্ধানী ও অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষায়। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও চিত্রকলা শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। তিনি শিশুদের ওপর চাপ প্রয়োগে বিশ্বাস করতেন না।
তার মতে, শিক্ষা হবে আনন্দময়—যাতে শিক্ষার্থী নিজেই শেখার প্রতি আগ্রহী হয়। সংগীত, কবিতা, নৃত্য ও চিত্রকলাকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে তিনি এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের উপায় মনে করতেন না; তিনি এটিকে আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের পথ হিসেবে দেখতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণময় জীবনের পথে পরিচালিত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং মানুষের নৈতিক, আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যম।
এছাড়া, তার শিক্ষা দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল আন্তর্জাতিকতাবাদ ও বিশ্বজনীনতা—জাতীয় সীমারেখার বাইরে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রসারিত করা, যেখানে বিশ্বসংস্কৃতির মিলন ঘটবে।
কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একটা সময় আসে, যখন মানুষ নিজেকে শিক্ষিত বলে পরিচয় দিতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। প্রশ্ন জাগে—আমি কি সত্যিই শিক্ষিত, নাকি কেবল প্রশিক্ষিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য মানুষের মুক্তি নয়; বরং নিয়ন্ত্রণ।
শৈশব থেকেই শেখানো হয়—ভালো ছাত্র হতে হবে, ভালো নম্বর আনতে হবে, ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে। কিন্তু কোথাও শেখানো হয় না কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমত গড়ে তুলতে হয়, অথবা কীভাবে অন্যায়কে চিনে নিতে হয়। এখানে শিক্ষা মানে মুখস্থ, আনুগত্য ও নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস। ফলে তৈরি হয় এমন প্রজন্ম, যারা সার্টিফিকেটে শিক্ষিত, কিন্তু চিন্তায় পরাধীন।
বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে শিক্ষা মানুষকে কৌতূহলী করে, সৃজনশীল করে, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখায়। আর আমাদের এখানে শিক্ষা মানুষকে নিরাপদ চাকরির স্বপ্ন দেখায়—যেখানে প্রশ্ন নয়, প্রয়োজন শুধু মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এই ব্যবস্থায় জ্ঞান নয়, বেশি মূল্য পায় অনুগত মনোভাব।
এই শিক্ষাব্যবস্থা আলোকিত করার জন্য নয়। এটি এমনভাবে সাজানো, যাতে মানুষ ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন না করে, বরং তার ভেতরে নিজের জায়গা খুঁজে নেয়। ধীরে ধীরে শিক্ষা হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক শৃঙ্খল—চোখে দেখা যায় না, কিন্তু চিন্তাকে শক্ত করে বেঁধে রাখে।
ফলে শিক্ষার নামে আমরা যে সময় ব্যয় করি, তার বড় অংশই যায় নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার পেছনে। আমরা শিখি নিয়ম মেনে চলতে, কিন্তু শিখি না—কেন সেই নিয়ম। এই অবস্থায় শিক্ষা আর মুক্তির পথ দেখায় না; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার এক সূক্ষ্ম অস্ত্রে পরিণত হয়।
এই দেশের ব্যবস্থায় শিক্ষা মুক্তি নয়; এটি নিয়ন্ত্রণের এক নীরব ও কার্যকর অস্ত্র। শিক্ষা তখনই মুক্তি দিতে পারে, যখন তা প্রশ্ন করার সাহস জাগায়। যতদিন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা মানুষকে ভাবতে শেখাবে না, ততদিন পর্যন্ত তা আলোকিত নয়—শুধু শাসিত মানুষ তৈরির কারখানা।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
