মোস্তফা কামাল আকন্দ
Published:2026-02-07 00:40:46 BdST
মাতারবাড়ীর বাস্তবতা আমাদের উন্নয়ন নীতির মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে"উন্নয়নের স্বপ্ন ছোয়ায় -যেখানে স্থানীয় মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে’’
মাতারবাড়ী আজ বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিপ্পান্ন হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চার লেনের সড়ক—সব মিলিয়ে এটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু এই দৃশ্যমানতার ভেতরে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন উঠে: এই উন্নয়ন কি মানুষের জন্য, নাকি শুধু অবকাঠামোর জন্য?
একসময় বলা হয়েছিল, মাতারবাড়ী হবে ‘সিঙ্গাপুর’। চকচকে সড়ক, বিশাল স্থাপনা আর চিমনির পেছনে তোলা ছবিতে সত্যিই একটি উন্নত ভবিষ্যৎ ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই ছবির বাইরে যে বাস্তবতা, তা আজ প্রায় অনুপস্থিত। মানুষ হারিয়েছে ঘরবাড়ি, নদী হারিয়েছে জীবন, ইতিহাস হারিয়েছে তার উপস্থিতি।
কোহেলিয়া নদী একসময় এই দ্বীপের জনজীবনের প্রধান ভরকেন্দ্র ছিল। নদী মানেই মাছ, কাজ, খাদ্য এবং চলমান অর্থনীতি। কিন্তু উন্নয়নের প্রয়োজনে নদী ভরাট করা হয়েছে। উন্নত সড়ক হয়েছে, যান চলাচল বেড়েছে। তবে, এত চমকপ্রদ উন্নয়নের ভীড়ে জেলেরা এখন নদীর পাড়ে বসে মাছ ধরার গল্প বলে ঠিকই তবে তারা কিন্তু আর মাছ ধরতে পারছে না।
লবণ উৎপাদনও ছিল মাতারবাড়ীর অর্থনৈতিক ভিত্তি। ডিসেম্বর এলেই এখানে কর্মচাঞ্চল্য দেখা যেত। অথচ এখন সেই সময়টিই হয়ে উঠেছে বেকারত্বের প্রতীক।
একদিকে দক্ষিণ উপকূলের অন্যান্য এলাকায় মানুষ লবণ তুলছে আর অন্যদিকে মাতারবাড়ীতে বসবাসরত পরিবারগুলো দীর্ঘশ্বাস তুলছে। এদের কেউ কেউ স্বপরিবারে ভিটেমাটি ছেড়ে জীবিকার তাগিদে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আবার অনেক পরিবারের কর্তাব্যক্তি পরিবার-পরিজন ছেড়ে অন্য অঞ্চলে যেয়ে কাজ করছেন। এরকমই একজন হচ্ছেন সাবিনা বেগম।
প্রাথমিক আলাপচারিতায় সাবিনা বেগম জানান যে, এই এলাকায় আগে প্রাণচাঞ্চল্য ছিলো। সবাই কোনও না কোন কাজে ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু সরকারি নানা প্রকল্পের কারণে জমি অধিগ্রহণ, নদী-খাল ভরাট হওয়ায় ধীরে ধীরে এই এলাকার জনজীবন বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "এতো উন্নয়নের পরও কাজ না থাকায় আমাদের অনেকেই অন্যত্র চলে গেছে। বেকার অবস্থায় আমরাও অনেকদিন অসহায় অবস্থায় ছিলাম। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে কোনো সরকারী সাহায্যও পাইনি।"
তিনি আরও বলেন, "দীর্ঘদিন বেকার থাকার পর আমার স্বামী জীবিকার তাগিদে কক্সবাজারে চলে যান। অনেক কষ্টে সেখানে একটি হোটেলে কাজ পেয়েছেন। এখন সেখানেই তিনি কর্মরত আছেন। প্রতিমাসে বেতন পেয়েই বাড়িতে ছুটে আসেন। খরচাপাতি দিয়ে আবার কর্মস্থলে চলে যান। তবে পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন জায়গায় থাকার কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশী হচ্ছে।"
এই পরিস্থিতি বর্তমানে মাতারবাড়ীর অধিকাংশ পরিবারেই বিরাজ করছে। কাজের জন্য বাইরে যাওয়া নতুন নয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নিজ এলাকায় কাজ না থাকা এখন প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হয়—এটাই প্রকৃত পরিবর্তন।
উন্নয়নের আগে এই মাতারবাড়ী ছিল তুলনামূলকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছ, লবণ, কৃষি—সব মিলিয়ে মানুষ নিজের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ পেত। উন্নয়নের পর দ্বীপটি হয়ে গেছে নির্ভরশীল ও অসহায়।
স্লুইচগেট বন্ধের কারণে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের অভিযোগ নতুন নয়। পানি দাঁড়িয়েছে, মানুষ বন্দী হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের কাঠামো অক্ষত। ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে মানুষ সময়, অর্থ ও মর্যাদা হারায়। কোথায় সেই অর্থ যায়, তার কোনো স্বচ্ছ জবাব নেই।
২০২৪ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছে, নিচে ঘনবসতিপূর্ণ মানুষ শ্বাস নিচ্ছে। বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে কয়লা ছাড়ছে, তখন বাংলাদেশ নতুন করে কয়লার ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে—পরিবেশগত এবং সামাজিক ঝুঁকি উভয়েই বেড়েছে।
কোহেলিয়া নদীর পাড়ে বসে বৃদ্ধ জেলে আবদুল করিম বলেন, “আমরা আর বেশি দিন এখানে থাকতে পারব না।” এটি ব্যক্তিগত হতাশা নয়, একটি এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক সংকেত।
উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে, তাদের স্থানচ্যুত করে, তাহলে সেই উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সাধারণ— “এই দ্বীপে কার জন্য জ্বলছে উন্নয়নের আলো?
যেখানে মানুষের ঐতিহ্যভিত্তিক পেশা হারিয়ে যাচ্ছে, লবণের মাঠ, পান উৎপাদন, মাছ, প্যারাবন সব ধ্বংস হচ্ছে, দ্বীপের সৌন্দর্য ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাদের জীবন ও ঐতিহ্য উন্নয়নের জন্য যদি ত্যাগই করতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য এবং ক্ষতির হিস্যা এই অঞ্চলের জনগণকেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত।”
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
