February 7, 2026, 2:21 am


আব্দুর রহিম রিপন

Published:
2026-02-07 00:22:27 BdST

‘আয় আয় হাদির লাশ নিয়ে যা’—পুলিশ কর্মকর্তার পৈশাচিক উক্তির ভিডিও ভাইরাল; পরিচয় শনাক্তে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম


‘আয় আয় হাদির লাশ নিয়ে যা’—পুলিশ কর্মকর্তার পৈশাচিক উক্তির ভিডিও ভাইরাল; পরিচয় শনাক্তে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

আব্দুর রহিম, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা


রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের মিছিলে পুলিশের হামলার ঘটনার চেয়েও এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ভিডিও ক্লিপ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের পোশাক পরিহিত এক কর্মকর্তা আন্দোলনকারীদের দিকে তেড়ে গিয়ে বলছেন, “আয়, আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা!”
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির বিচারের দাবিতে যখন রাজপথ উত্তাল, ঠিক সেই মুহূর্তে খোদ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর একজন সদস্যের মুখে এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক উক্তি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—কে এই পুলিশ কর্মকর্তা? কার নির্দেশে বা কোন সাহসে তিনি একজন শহীদের লাশ নিয়ে এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার ধৃষ্টতা দেখালেন?


ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা গেছে
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের পর শাহবাগ মোড় থেকে ইনকিলাব মঞ্চের মিছিলটি যখন যমুনার দিকে এগোতে চায়, তখন পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আটকায়। ভাইরাল হওয়া ফুটেজে দেখা যায়, হেলমেট ও রায়ট গিয়ার পরিহিত এক পুলিশ কর্মকর্তা অত্যন্ত উত্তেজিত ভঙ্গিতে আন্দোলনকারীদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে শাসাচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি চিৎকার করে বলেন, “আয়, আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা!”
তার এই বক্তব্যের সময় পাশে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যদেরও মারমুখী অবস্থানে দেখা যায়। ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। নেটিজেনরা এই পুলিশ কর্মকর্তার ছবি জুম করে শেয়ার করছেন এবং অবিলম্বে তার পরিচয় ও পদবি প্রকাশ করার দাবি জানাচ্ছেন।


কে এই পুলিশ কর্মকর্তা?
ভিডিওটি ভাইরাল হলেও এখন পর্যন্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তার নেমপ্লেটটি ভেস্টের আড়ালে থাকায় নাম পড়া যাচ্ছিল না। তবে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, তিনি ডিএমপির রমনা জোনের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অথবা বিশেষ কোনো ইউনিটের সদস্য হতে পারেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এক জরুরি বিবৃতিতে বলেছেন, “যেই পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের ভাই হাদির লাশ নিয়ে এমন জঘন্য উপহাস করেছে, তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হবে এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে। যদি প্রশাসন তার নাম গোপন করার চেষ্টা করে, তবে আমরা ধরে নেব এই পৈশাচিক মানসিকতা পুরো পুলিশ প্রশাসনের।”


লাশ নিয়ে রাজনীতি’র অভিযোগ ও ক্ষোভ
শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে কেন্দ্র করে ইনকিলাব মঞ্চ দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ কেবল লাঠিপেটা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মানসিকভাবেও আঘাত করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী রাফি আহমেদ বলেন, “পুলিশের কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু একজন পুলিশ যখন ‘লাশ নিয়ে যা’ বলে টিটকারি মারে, তখন বোঝা যায় তাদের মগজে কতটা ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এটা কোনো সাধারণ উক্তি নয়, এটা স্পষ্ট উসকানি। আমরা অবিলম্বে এই অফিসারের মুখোশ উন্মোচন চাই।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, কোনো পরিস্থিতিতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের এমন অপেশাদার ও অমানবিক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মৃত ব্যক্তির প্রতি চরম অবমাননা।


প্রশাসনের নীরবতা ও আল্টিমেটাম
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, “ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এটি এডিটেড কি না বা কোন প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
তবে ইনকিলাব মঞ্চ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই তদন্তের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে নারাজ। তারা ঘোষণা দিয়েছে, শনিবার দুপুরের মধ্যে ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করে তাকে গ্রেপ্তার করা না হলে, শাহবাগ থানা ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।


নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি শেয়ার করে হাজার হাজার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। একজন লিখেছেন, “এই পুলিশ অফিসারের পরিচয় বের করা কি খুব কঠিন? তার ছবি তো স্পষ্ট। জনগণ তাকে চিনে রাখতে চায়।” আরেকজন লিখেছেন, “শহীদের রক্ত আর লাশ নিয়ে এমন উপহাসের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হবে।”
শাহবাগের বাতাস এখন বারুদের গন্ধে ভারী। লাঠিচার্জ আর টিয়ারশেলের ধোয়ার চেয়েও ‘হাদির লাশ নিয়ে যা’—এই বাক্যটি এখন আন্দোলনকারীদের বুকে বেশি বাজছে। এই একজন পুলিশ কর্মকর্তার ঔদ্ধত্য পুরো পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.