এস এম ফতিন সাদাব
Published:2026-01-25 12:21:35 BdST
আওয়ামী লীগ নেতাদের বিস্ফোরক মন্তব্যজিকে শামীম কখনই আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না
গোলাম কিবরিয়া শামীম। যিনি জি কে শামীম নামেই বেশি পরিচিত। তিনি জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের কর্ণধার। অর্থপাচার মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর হাইকোর্টের আদেশে মুক্ত হয়ে এফটি টীমের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় নিজেকে মূলত একজন বৈধ সরকারি ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন জি কে শামীম। তিনি বলেন, আমি কখনোই যুবলীগ তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না।
ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সূত্র ধরে তাকে যুবলীগ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ করে জি কে শামীম বলেন, যুবলীগের কমিটিতে থাকা তো দূরের কথা, তিনি কখনোই যুবলীগের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেন না।
সূত্র মতে, ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সালে জি কে শামীমকে গুলশান নিকেতনস্থ তার কার্যালয় থেকে আটক করেছিল এলিট ফোর্স র্যাব। ওই সময় র্যাব কর্মকর্তারা দাবী করে ‘তিনি (জিকে শামীম) ছিলেন যুবলীগ নেতা।
কিন্তু গ্রেপ্তারের পরদিনই ২১ সেপ্টেম্বর তৎকালীণ যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী উত্তরা-আজমপুরে যুবলীগের ওয়ার্ড সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, "জি কে শামীম কোনো কালে, কোনো সময়ে, কোনো দিন যুবলীগের কেউ ছিল না।"
পরে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে যুবলীগ চেয়ারম্যান পরিষ্কার করে বলেন, ‘যুবলীগের কোনো পদে সে আছে? আমি যুবলীগের চেয়ারম্যান; আমি তো তাকে নেতা বানাইনি। যুবলীগের কমিটির কোথাও তো তার নাম নেই। তাহলে আপনারা কেন বলছেন জিকে শামীম যুবলীগের নেতা? আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, জিকে শামীম অথবা গোলাম কিবরিয়া শামীম নামে যুবলীগের কোনো নেতা নাই।“
ঐ সময় কিছু গণমাধ্যমে জিকে শামীমকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, "জি কে শামীম নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নন, তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন। সহসভাপতি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হচ্ছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী।“
একই সময় আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া প্রভাবশালী একাধিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতেই জি কে শামীম নেই। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলা বা মহানগর আওয়ামী লীগের তালিকায় জি কে শামীম নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নাই।'
২০১৭ সালের ১০ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির অনুমোদন হয় জানিয়ে সেই কমিটির একটি অনুলিপি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে বিপ্লব আরও বলেন, জেলা কমিটিতে জি কে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির নাম নেই। আওয়ামী লীগের সাথে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।“
আওয়ামী লীগের তৎকালীন উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া আরও বলেন, জি কে শামীমকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’।
এদিকে, সেই সময়কার যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেন, `জি কে শামীম এক সময় যুবদলের সহ-সম্পাদক ছিল। জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠদের দাবী এই বক্তব্যও সঠিক নয়।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ তার ভয়েস বাংলায় ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর এক সংবাদ বিশ্লেষণে বলেন, ‘২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের বলয়ের বাইরে যারা ঠিকাদার ছিলেন; তারা যাতে শেষ হয়ে যায় সেজন্য এই ধরনের সাজানো অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল জিকে শামীমের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারী ব্যবসা দখল করে নেওয়া। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে জিকে শামীম আটক ছিলেন।’
শামীমকে নিয়ে এখনো ষড়যন্ত্র করছে স্বার্থান্বেষী মহল
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, জিকে শামীম ছাত্রজীবনে ছাত্র দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নাসির উদ্দিন পিন্টু ও হাবিব উন নবী সোহেল কমিটির সময় তিনি বিভিন্ন পদে ছিলেন।
নিজের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জিকে শামীম এই প্রতিবেদককে বলেন, ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। সেই সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল শাখা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ছিলাম। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের সময়ে আমি ঢাকা মহানগর যুবদলের সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
তিনি আরও বলেন,৷ পরবর্তীতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে আমি পুরোপুরি ঠিকাদারি ব্যবসায় মনোনিবেশ করি।
জিকে শামীম দাবি করেন, তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিশেষ শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের সময় র্যাব হেডকোয়াটার্স ভবন, বাংলাদেশ সচিবলালয়ে ২০ তলা ভবন, ঢাকার হেয়ার রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভবনসহ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার কাজ চলমান ছিলো জিকে বিল্ডার্সের।
এফটি টীমের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জিকে শামীমের এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তার হওয়ার সময় জিকে শামীম দাবি করে বলেন, তিনি একটি ভয়ানক স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর চক্রান্তের শিকার হন। তারা মূলত ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রশাসনের কাছে ভুল বার্তা দিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করিয়েছেন।'
এদিকে, জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরকারের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী বিভিন্ন ঠিকাদারগণ জিকে শামীমের সকল ব্যবসা নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নেন। এতে জিকে শামীম আর্থিকভাবে বিশাল লোকসানে পড়েন এবং তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জিকে শামীম সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহলের রোষাণলে পড়ে আমার জীবন থেকে ছয়টি বছর হারিয়ে গেছে। আমি বিনা দোষে ৬ বছর কারাবরণ করেছি, সাজা খেটেছি। আমার সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সম্বলিত ফটোকার্ড ও পোস্ট প্রচার করে আমাকে হেয় করার অপচেষ্টা চলছে। আমি এসবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।'
উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ১৯৫ কোটি টাকা পাচারের মামলায় ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই জি কে শামীমকে ১০ বছরের সাজা দিয়েছিল ঢাকার একটি আদালত। পাশাপাশি তাকে তিন কোটি ৮৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৪ টাকা জরিমানা করা হয়।
পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন জি কে শামীম। ওই আপিলের প্রেক্ষিতে গত ৭ আগস্ট বিচারপতি এ এস এম আব্দুল মোবিন ও বিচারপতি মো. যাবিদ হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ জি কে শামীমের আপিল মঞ্জুর করে তাকে জি কে শামীমকে ১০ বছরের সাজা থেকে খালাস দেন।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
