05/14/2026
শাহীন আবদুল বারী | Published: 2026-05-14 20:31:19
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু 'মাফিয়া ডন' হিসেবেই অধিক পরিচিত। তিনি স্টোর কিপার পদে চাকরি করলেও হাসপাতালের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। তৃতীয় শ্রেনী এই কর্মচারী পতিত সরকার আমল থেকেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। কার্যত এই হাসপাতালটি পরিচালিত হয়ে থাকে তার আঙ্গুলের ইঁশারায়। সেতুর ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারে অতিষ্ঠ হাসপাতালের ডাক্তার,নার্স ও সাধারণ কর্মচারীরা।
জানা গেছে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রন, জনবল নিয়ন্ত্রন, প্রশাসনিক কার্ক্রমের উপর প্রভাব বিস্তার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সামলানোসহ সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক হচ্ছে স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু। হাসপাতাল চত্বরে সেতু এক আতঙ্কের নাম। তার এই অবস্থানের কারনে ইতিমধ্যে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ডন” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সেতু এখন স্টোর কিপারের বদলে কোটিপতির খাতায় নাম লেখিয়েছে। অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সেতু দামি গাড়ি, আশিসান বাড়ি, সুন্দরী নারী ও ব্যাংক ব্যালেন্স সহ সবই অজর্ন করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালে জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার তদবীরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার হিসেবে যোগদান করেন মোজাম্মেল হক সেতু। যোগদানের পর থেকে হাসপাতালের এমএসআর সহ সকল প্রকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রন ও ভাগবাটোরা করে আসছে। হাসপাতালে সেতুর যোগদানের পর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে তাকেই কোটি কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রনের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পাবার পর সেতুর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মন্ত্রী-এমপি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও সন্ত্রাসীদের আস্থাভাজন হয়ে উঠে অল্প সময়ের মধ্যেই।
হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে, পরিচালক ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছেন উক্ত স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল হক ফারুককে ৮ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সেতুর বিরুদ্ধে। চাকরিতে যোগদানের পর তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত এইচ এন এফ পিও ড. প্রবীর কুমারের নেতৃত্বে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন মোজাম্মেল হক। সেখানে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০২১ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন অর্থলোভী এই সেতু।
পরবর্তীতে, ২০২১ সালেই টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি হোন মোজাম্মেল হক। এখানেও আওয়ামী লীগের এক নেতার তদবিরে দায়িত্ব পান স্টোর কিপারের। টাঙ্গাইলে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েই হাসপাতালে আধিপত্য বিস্তার করেন মোজাম্মেল হক। তিনি দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'তায়েফ এন্টারপ্রাইজ' এর স্বত্বাধিকারী জুবেলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেন। সেই সুবাদে, জুবেলকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কোটেশনের মাধ্যমে কাজ দিতেন সেতু। তারা দুজন মিলে হাসপাতালের বিপুল অর্থ লোপাট করলেও এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরবর্তীতে, দু'জনের আর্থিক লেনদেনজনিত কোন্দলে জুবেলের সেফওয়ে সার্জিক্যাল প্রতিষ্ঠানকে চক্রান্ত করে ব্লাকলিস্ট করা হয়।
এমএসআর (মেডিকেল সার্কেল রিকোজিট) ক্রয়ে কোটি কোটি টাকার টেন্ডারে কোন ঠিকাদারের লাইসেন্স কাজ পাবে আর কোন ঠিকাদারের লাইসেন্স পাবে না; তার সবকিছুই ছিল সেতুর দায়িত্বে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ পেতে দারস্থ হতো সেতুর। টেন্ডারের কাজ ভাগবাটোয়ারা করার পর কমিশনের কালেকশন আওয়ামী লীগের হাতে পৌছানোর দায়িত্ব ছিল সেতুর প্রধান কাজ। দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য সেতুর উপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং রাজনীতিবিদরাও সেতুর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
নিয়ম অনুযায়ী, টেন্ডারের সকল ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুদ থাকে স্টোরে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্র অনুসারে মালামাল সরবরাহ করে থাকে স্টোর কিপারের কাছে। সেখান থেকে একটি কমিটির মাধ্যমে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। আর এখানেই কোটি কোটি টাকার খেলা। বাজারের নিম্নমানের ওষুধ, যন্ত্রপাতি আর চিকিৎসা সরঞ্জাম স্টোরে জমা করে তা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ক সরবরাহের একক নিয়ন্ত্রন সেতুর হাতেই পরিচালিত হয়ে থাকে। মালামালের মান যাচাই বাছাইয়ের কোন তোয়াক্কা না করে এভাবে অর্থ কামানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালের এক ঠিকাদার জানান, টেন্ডারে অংশ নিয়ে টাঙ্গাইলের একাধিক যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পেলেও সেতুর মনোনীত ও পছন্দের ঠিকাদাররাই কার্যাদেশ পেয়েছে। যাদের সকলেই ঢাকার ঠিকাদার। কারন হিসেবে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নেয়া কঠিন হলেও বাইরের ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেয়া কঠিন নয়। তাছাড়া নিম্নমানের ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহের জন্যে জেলার বাইরের ঠিকাদাররা নির্ভরযোগ্য। টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রেও অনেকটা নিরাপদ। যার কারনে সরকারের খাতায় কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকেও কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে, টেন্ডারে অনিয়মের কারনে ইতিমধ্যে সরকারের প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা গচ্ছাও গেছে। তবে এই টাকা ঢুকেছে হাসপাতালের সিন্ডিকেটের পকেটে। আর বিশাল অংকের এই টাকা সবাইকে নিতে হয়েছে সেতুর হাত থেকেই।
ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা এই প্রতিবেদককে জানান, টেন্ডারে সব ধরনের লিয়াজো করেন স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক। তার হাত দিয়েই বিভিন্ন স্তরে টাকার ভাগভাটোয়ার চলে যায়। টাকা না দিলে ঠিকাদারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। যারা সেতুকে ম্যানেজ করেন, তারাই শুধু কাজ পান। নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার কাজ পেলেও অধিকাংশ ঠিকাদার কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসাপাতালে সেতুর প্রভাব আর দাপটের কাছে স্বয়ং পরিচালকসহ ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্চারীরা জিম্মি হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলের একমাত্র প্রতিনিধি সেতু অল্প সময়ের মধ্যেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। সম্প্রতি তার ছোট ভাই ও ভাইয়ের বউকে আমেরিকা পাঠানোর পর এলাকায় সেতুর বিপুল টাকা কামানোর বিষয়টি সামনে আসে। প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের প্রাইভেট কারসহ রাজকীয় চালচলনে স্থানীয়রা রীতিমত অবাক হয়ে যায়। অল্প সময়ে সামান্য চাকুরী করে এত টাকার মালিক কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে চলছে নানা কৌতহল ও জল্পনা কল্পনা। অতি সম্প্রতি, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএসআর টেন্ডারে দুর্নীতির সংবাদ গনমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে হাসপাতালে সেতুর আধিপত্য ও ক্ষমতার তথ্য প্রকাশিত হয়।
সরেজমিনে গিয়ে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মোজাম্মেল হক সেতুর উথান সিনেমার গল্পের মত। তৃতীয় শ্রেনীর একজন কর্চারী হয়েও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মত এত বড় একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করা অতটা সহজ বিষয় নয়। এর জন্যে সাহস ও মেধার প্রয়োজন পড়ে।
সূত্র মতে, স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু ঘুষের টাকায় টাঙ্গাইলের রেজিস্ট্রি পাড়ায় ক্রয় করেছেন একটি ফ্ল্যাট। এছাড়াও তার এফডিআরসহ বিপুল ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে। পাশাপাশি তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়েছেন নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়। নিজে চলাফেরা করেন "টয়োটা এক্সিও" মডেলের গাড়িতে। অবশ্য ধূর্ত সেতু এই গাড়ির কাগজপত্র তার বাবার নামে করেছেন। উল্লেখ্য যে, সেতুর পিতা টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন এর কার্যালয়ের অফিস সহকারী ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও চাকরিকালীন সময়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মোজাম্মেল হক সেতু মাদক সেবন ও জুয়ায় আসক্ত। সে মদ, গাঁজা, ইয়াবা সহ সব ধরনের নেশায় অভ্যস্ত। অধিকাংশ সময় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কর্মস্থলে দায়িত্বরত থাকার কারণে হাসপাতালের মহিলা কর্মচারীরাও তার উপর অতিষ্ঠ। কিন্তু চাকরি হারানো কিংবা বদলির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেনা।
এদিকে, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ক্লাব সহ জুয়ার আসরগুলোতেও মোজাম্মেল হক সেতু "জুয়ারি" হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন। সেতু প্রতিদিনের অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়ে জুয়া খেলেন বলে ঠিকাদারদের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টিয়েছে সেতু। সরকারি দলের শেল্টার নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে পরিচালক কুদ্দুস ও স্টোর কিপার সেতু। অনেকটা সামলিয়েও উঠেছেন পরিচালক সিন্ডিকেট।
সূত্রমতে, সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক ভোলার আত্নীয়-স্বজন পতিত সরকার আমলে হাসপাতালটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক ভোলা ছিলেন হাসপাতালের সভাপতি। হাসপাতালের ৪ হাজার স্কয়ার ফিট ক্যান্টিন অনেক কম মূল্যে ভাড়া দেয়া হয়েছিল। এখন শুধু হাত বদল হয়েছে। উক্ত সঙ্গবদ্ধ চক্র পরিচালক, স্টোর কিপার ও হিসাব রক্ষককে ম্যানেজ করে প্রতিদিন দুইশত রোগির খাবারের বিল অতিরিক্ত করেন। তাদের এই শুক্ক কারচুপির খবর সর্বত্র প্রচার থাকলেও সরকারি ভাবে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোজাম্মেল হক সেতুর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। উপরন্তু হাসপাতালে গিয়ে সেতুর সাথে দেখা করতে চাইলে তার সাঙ্গপাঙ্গরা এই প্রতিবেদককে বলেন, "সেতু ভাই হাসপাতালে নেই। পরে আইসেন।"
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81